উত্তোলনে তীব্র হচ্ছে ভাঙন বাঁধা দেওয়ায় নারীকে প্রাণ নাশের হুমকি
নিজস্ব প্রতিনিধি :
সোনাগাজীতে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রভাবশালী মহলের ছত্র ছায়ায় ছোট ফেনী নদীর চর মজলিশপুর ইউনিয়নের মিয়াজী ঘাট এলাকায় তিনটি মেশিন বসিয়ে নতুন করে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু করেছে একটি চক্র। এতে করে নতুন নতুন এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বিএনপির মহিলা নেত্রী মালা বেগমের নেতৃত্বে স্থানীয় লোকজন নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে বাঁধা দেওয়ায় বালু-খেকো বিএনপিকর্মী হারুনুর রশিদ মোবাইল ফোনে মালা বেগমকে প্রাণ নাশের হুমকি প্রদান করে। ভবিষ্যতে বাঁধা দিলে তাঁকে কেটে টুকরো টুকরো করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিবে বলে হুমকি দেয়।
স্থানীয় লোকজন জানায়, নোয়াখালী ও ফেনীর সীমান্তবর্তী মুছাপুর এলাকায় রেগুলেটর না থাকায় সমুদ্রের জোয়ারের পানি নির্বিঘ্নে প্রবেশ করায় ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চর চান্দিয়া, চর দরবেশ, বগাদানা ও চর মজলিশপুর ইউনিয়নের ছোট ফেনী নদীর তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে নদী ভাঙনের কারনে বেশ কয়েকটি রাস্তা ও ছোট ছোট কালভার্ট এবং কয়েকটি সেতুও ভেঙে নদীতে চলে গেছে। বিশেষ করে এ চারটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা এতই বেশি যে রাতে-দিনে সমান তালে বাড়িঘর ও ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনরোধে প্রশাসন উদ্যোগ নিলেও তা অপ্রতুল। এদিকে নদী ভাঙন, অন্যদিকে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে।
গত বুধবার চর মজলিশপুর ইউনিয়নের মিয়াজী ঘাট এলাকার লোকজন বালু উত্তোলন বন্ধ ও নদী ভাঙনের হাত থেকে ঘরবাড়ি রক্ষায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিগ্যান চাকমার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। এতে তাঁরা বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ইউনিয়ন বিএনপিকর্মী হারুনুর রশিদ, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক মো. তুষার, যুবদলকর্মী মো. সুমন, মো. সোহেল ও মো.মামুনসহ বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন।
স্থানীয় মহিলা দলের নেত্রী মালা বেগম বলেন, গত মঙ্গলবার বিকেলে তিনি স্থানীয় এলাকার লোকজনকে নিয়ে মিয়াজীঘাট এলাকায় গিয়ে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ক্ষোভ জানিয়ে নদী ভাঙনের হাত থেকে এলাকাবাসীকে রক্ষায় দ্রুত বালু উত্তোলন বন্ধ করে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বালুদস্যু হারুনুর রশিদ ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মো. তুষার মুঠোফোনে তাঁকে গালিগালাজ করে বালু উত্তোলন নিয়ে কথা বললে তাঁকে প্রানে মেরে লাশ টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। বিষয়টি তিনি ইউএনও রিগ্যান চাকমাসহ বিএনপির নেতাদেরকে জানিয়েছেন।
স্থানীয় সাইফুল ইসলাম বলেন, নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে বিভিন্ন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এই অবস্থায় গত এক সপ্তাহ যাবৎ স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা চর মজলিশপুর ইউনিয়নের মিয়াজী ঘাট এলাকায় ভাঙনের মধ্যেও নদীতে ৩টি বাল্কের মাধ্যমে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রির জন্য নদীর তীবে স্তুপ করছে।
মিয়াজী ঘাট এলাকার বাসিন্দা আমেনা বেগম বলেন, জোয়ারের পানির স্রােত আর নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে চোখের সামনে বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাঁদের আহজারিতে ভারি হয়ে উঠছে আশপাশের আকাশ-বাতাস। কিভাবে কি করবেন কোন কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। সহায়-সম্বল হারিয়ে কোথায় গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করবেন তা নিয়ে সবার চোখে মুখে শুধু চিন্তার ভাজ।
সাইদুল হক নামে স্থানীয় একব্যক্তি বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে গেছে। বালু উত্তোলনকারীরা সরকার দলীয় হওয়ায় কেউ তাঁদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না। এরপরও তাঁরা বালু উত্তোলন ও ভাঙনের ছবি তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠান। তিনি তাৎক্ষণিক চর মজলিশপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মফিজুর রহমান বালু উত্তোলন এলাকায় পরিদর্শন করে তাঁকে বিস্তারিত তথ্য দিতে বলেন। ইউপির প্রশাসনিক কর্মকর্তাও গত বৃহস্পতিবার পরিদর্শন করে বিষয়টি ইউএনওকে অবহিত করেন।
এবিষয়ে কথা বলতে বিএনপিকর্মী হারুনুর রশিদ ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মো. তুষারের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিগ্যান চাকমা বলেন, বালুর চাহিদা থাকায় বালু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় বালু উত্তোলনে জনগণের অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। যদি জনস্বার্থ নষ্ট হয়। সে ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণের আলোকে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।