সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ ০৩:০৩

ফেনীতে ট্রাফিক পুলিশকে চাঁদা দিয়ে চলে অটোরিকশা


* দেয়া হয় ভূয়া মামলা
* ১হাজার টাকার রেকার খরচে মেলে চলাচলের অনুমতি
* টাকা দিলেই মিলে মামলা থেকে রেহাই
* চাঁদা নেয়ার অভিযোগ ফেনী পৌরসভার বিরুদ্ধেও
* কমিশন পান শ্রমিক নেতারাও


শহীদুল ইসলাম : ফেনীতেও নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।  ৪হাজারেরও বেশি এসব অটোরিকশা চলাচল করে থাকে কেবল ফেনী শহরেই। যাত্রিরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য প্যাডেল রিকশার বদলে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশায় চড়লেও শহরে ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রিকশা হওয়ায় যানজটের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসব যানবাহন চলাচলে মামলার আড়ালে ভূয়া মামলা যেমন অহরহ, তেমনি হাজার টাকার রেকার খরচে মিলে চলার অনুমতি। মাঝেমাঝে প্রশাসন ও পৌরসভা থেকে অভিযান হলেও সেই সব যেন লোক দেখানো। এসব মামলায় বেশিরভাগ অটোরিকশা চালককে দেয়া হয়না কোন রশিদ। এছাড়া ২শ টাকা থেকে ৫শ টাকা হলে তাৎক্ষণিক ছাড়াও পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাফিক পুলিশের অনেকের নিজস্ব অটোরিকশা চলাচল করে থাকে। এসব বিষয়ে কথা হয় অন্তত অর্ধশতাধিক চালকের সাথে।
চালকদের সাথে কথা বলে ও সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, শহরে মহিপাল জিরো পয়েন্ট ও ট্রাংক প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন অটোরিকশা ধরা হয়। অনেক সময় দিনে শতাধিক অটোরিকশা ধরে থাকে ট্রাফিক বিভাগ। এরমধ্যে কিছু জব্দ করা হলেও অনেক চালক থেকে এক হাজার থেকে পনেরশো টাকা নিয়ে ছেড়েও দেয়া হয়। আবার ট্রাফিক কনস্টেবলদের ২শ থেকে ৫শ টাকা দিলেই সাথে সাথে ছেড়ে দেয়ার ঘটনাও অহরহ। ট্রাফিক ইন্সপেক্টর থাকাকালীন ধরলে অনেক সময় যেমন মামলা দেয়া হয়, আবার ১হাজার রেকার খরচ দিলে ছেড়ে দেয়া হয়। অনেক সময় ট্রাফিক বিভাগের মুন্সিকে এক থেকে দেড় হাজার টাকা দিলেও ছেড়ে দেয়া হয়। তবে যেসব মামলা দেয়া হয় এসব মামলার বেশিরভাগই আবার ভূয়া মামলা। মামলার প্রমাণ হিসেবে দেয়া হয় না কোন রশিদ।

বিশেষ করে মহিপাল ট্রাফিক পুলিশের বিদায়ী ট্রাফিক ইন্সপেক্টর এনায়েত কবির এর বিরুদ্ধে অভিযোগ অহরহ। তিনি বর্তমানে বদলী হয়ে নোয়াখালীর ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ১হাজার টাকার বিনিময়ে চালকদের এক সপ্তাহের জন্য টোকেন দিতেন। টোকেন দিয়ে বাঁধা ছাড়াই চলাচল করতো এসব অটোরিকশা। এক্ষেত্রে কয়েকজন দালাল মধ্যস্থতা করে থাকেন।

এছাড়া ট্রাফিক সদস্যদেরও নিজস্ব অটোরিকশা রয়েছে বলেও একাধিক সূত্র জানায়। অভিযোগ ফেনী পৌরসভার বিরুদ্ধেও। অভিযান চলাকালে ফেনী পৌরসভায় অটোরিকশা নেয়ার পর কতিপয় কর্মকর্তাদেরকে চাঁদা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হয় বলে দাবী একাধিক চালকের। অন্যদিকে এসব চাঁদার ভাগ বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিক নেতাদের কাছে যায় বলে জানা যায়। এছাড়াও সংবাদিক পরিচয়েও কয়েক ব্যক্তির অটোরিকশা অবাধে চলাচল করে। ট্রাফিক বিভাগ আবার এসব অটোরিকশা ধরতে গেলে ওইসব সাংবাদিকরা দেনদরবার করেন।

কিশোরগঞ্জ থেকে আসা হৃদয় হোসেন নামে এক চালক জানান, ১৫দিন পূর্বে মহিপালে তার অটোরিকশা ধরা হয়েছিলো। এভাবে তিন থেকে চারবার সে পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছিল। প্রতিবারে এক হাজার টাকার বিনিময়ে ছাড়া পেয়ে যেতো বলে তিনি জানান।

সিয়াম নামে নোয়াখালী থেকে আসা আরেক চালক জানান, ১হাজার টাকার বিনিময়ে ৩দিন চালানোর অনুমতি পাওয়া যায়। কিন্তু ৩দিন পর মহিপাল অতিক্রম করতে গেলে ধরা পড়ে আবারও ১হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া তার অভিযোগ, একবার তার থেকে মামলা দেয়ার নাম করে ২হাজার ৬শ টাকা নেয়া হয়েছে। কিন্তু মামলার কোন রশিদ দেয়া হয়নি।

শেখ মুজিব নামে একজন বলেন, ‘এক হাজার টাকা রেকার খরচ নেয়া হয় আমাদের থেকে। মাঝে মধ্যে কাগজ একটা দেয়। ওইটারও কোন মূল্য নেই। সুযোগ পেলে আবারো ধরে।’

লালমনির হাট থেকে আসা মাজেদ নামে এক চালক জানান, গাড়ি ধরে নেয়ার পর মামলা দেয়া হয়। ২হাজার ৫শ টাকা মামলার খরচ নেয়া হয়। ১শ টাকা করে ফটোকপি করার খরচ নেয়া হয় বলে তিনি জানান। তবে তার গাড়ি নিয়ে দুইবার মামলা হলেও একবার তিনি কোনো রশিদ পাননি।
সোহেল নামে নোয়াখালী থেকে আসা এক চালক জানান, তার অটোরিকশা গত বুধবারে ধরা হয়। ২হাজার ৬শ টাকা তার কাছ থেকে নেয়া হয়। এর ২০দিন আগেও তাকে ধরে নিয়ে মামলা দেয়ার কথা বলে ২হাজার ৬শ টাকা নেয়া হয়। কিন্তু রশিদ দেয়া হয়নি।

বারাহিপুর গাজী ক্রস রোডের বাসিন্দা মো. শহীদ নামে এক চালক জানান, ‘২শ থেকে ৫শ টাকা দিলে কনস্টেবল ছেড়ে দেয়। এটা প্রায়ই সময় হয়। তিনি বলেন, ‘কিন্তু আজ টিআই নিজে ধরে আনছে। এখন ১হাজার টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিতে হবে অথবা মামলা দিলে ২হাজার ৬শ টাকাও দিতে হতে পারে।’

এছাড়া জয়পুর হাটের মুন্না ও সোনাগাজীর নাদিম নামে এ চালক জানান, ট্রাফিক পুলিশ তাদের কাছ থেকে ১হাজার টাকা বা ২হাজার ৬শ টাকা নিয়ে যায়। কিন্তু তাদের কোন রশিদ দেয়া হয় না। এছাড়া নাদিমের রিকশা একবার ফেনী পৌরসভায় নিয়ে গেলে সেখান থেকেও টাকার বিনিময়ে নিয়ে আসতে হয়েছে বলে তিনি জানান।

এছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালক বলেন, ‘আমি ট্রাংক রোডে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার গাড়ী ধরছে। ধরার পর আমাকে থানায় নিয়ে গেছে। অনুরোধ করছি, ছাড়ে নাই। আমি কোন রং করি নাই। এরপরও গাড়ি ধরে নিয়ে গেছে। এরপর মামলা দেয়ার কথা বলে আমাকে মাছুম নামের একজনের কাছে নিয়ে গেছে কিন্তু আর মামলা দেয়নি। পরে আমি অনুরোধ করার পর আমাকে আড়ালে নিয়ে যায়। সেখানে ১হাজার ৫শ টাকা দিয়ে, গাড়ি ছাড়া পেয়ে চলে আসি। এই টাকার কোনো রশিদ আমাকে দেয়নি সে।’
এ বিষয়ে ফেনী ট্রাফিক বিভাগ (প্রশাসন) ইন্সস্পেক্টর সাহাদাত হোসেন এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে পরবর্তীতে কথা বলবেন বলে আর বলেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!