জুন ১৫, ২০২৬ ২২:০১

৬ একরের কৃষি খামার থেকে ৭০ একরের সমন্বিত খামার সোনাগাজীতে এক খামারে উৎপাদিত হচ্ছে দেশী-বিদেশী ১০২ জাতের আম


আমজাদ হোসাইন, সোনাগাজী :

সোনাগাজী উপজেলার সাহাপুর এলাকার বাসিন্দা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর মো. সোলায়মান এখন একজন সফল খামারি ও উদ্যোক্তা। ১৯৮৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে গিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আম, কাঁঠাল, নারকেল, ড্রাগন, পেয়ারা, পেঁপে, কলা, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন, মধু, সরিষা উৎপাদন ও নার্সারী বাগান তৈরীসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল ও ফলন উৎপাদনে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।


অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মো. সোলায়মান দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে প্রাপ্ত অভিজ্ঞাতাকে কাজে লাগাতে মাত্র তিন লাখ টাকা পুঁজি দিয়ে ১৯৯২ সালে উপজেলার মুহুরী প্রকল্প এলাকায় মাত্র ছয় একর জমিতে পারিবারিক কৃষি খামার প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে সে খামারে গবাদিপশু পালনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা উৎপাদনে নার্সারী বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। সে সঙ্গে বিশাল একটি পুকুর খনন করে মৎস্য চাষও করেন। মৎস্য খামারের চারদিকে পাড়ে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কয়েকটি জাতের আম গাছের চারা এনে লাগান। এর পর আর তাঁকে পেছনে তাঁকাতে হয়নি। ছয় একরের খামারটি বর্তমানে ৭০ একর জায়গা জুড়ে বিশাল একটি সমন্বিত খামারে পরিণত হয়েছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সোনাগাজী সোয়াস এগ্রো কমপ্লেক্স’। উপজেলা সদর থেকে মাত্র ১০কিলোমিটার দক্ষিণে ভ্রমণ পিপাসুদের একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র মুহুরী প্রকল্পের পাশে সোনাগাজী সোয়াস এগ্রো কমপ্লেক্স নামে সমন্বিত খামারটির অবস্থান।


শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মধুরানী, কলাবতী, বারি- ১১, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসা, রুপালী, তোতাপুলি, আম্রপালি, হাঁড়ি ভাঙা, মরিয়ন, লুবনা, কাঁচামিঠা, কিউজাই, রেড পালমার, রেড তাইওয়ান, হানিডিও, নাম ডগমাই, সূর্যডিম, কাটিমন, থাইর‌্যান্ডের আম মিয়াংমাই, পৌরমতি, ক্যান্ট, ব্যানানাসহ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগা, দিনাজপুর, রংপুরসহ দেশীয়-বিদেশী ১০২ জাতের আম সোনাগাজী সোয়াস এগ্রো কমপ্লেক্সের বিশাল বিশাল মৎস্য প্রকল্পের পুকুরের পাড়ে গাছগুলোতে ঝুলছে রঙ বে-রঙের আম। দেখে যেন মনে হচ্ছে এটি একটি আমের রাজ্য। পুরো বাগান এলাকায় আমের মধুর ঘ্রাণে নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আম, মধু, সরিষা কিনতে এবং বাগানটি এক নজর দেখতে স্থানীয়দের পাশাপাশি গাড়ি নিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে ভিড় করছেন। পুরো বাগানে বর্তমানে আমেরিকা, স্পেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত, ভুটান, চীন, অষ্ট্রেলিয়াসহ দেশী-বিদেশী মিলে ১০২ জাতের আম রয়েছে। মাছ চাষের জন্য খনন করা বিশাল বিশাল ৮-১০টি পুকুর পাড় জুড়ে নজরকাটা সারি সারি নানা প্রজাতির আম গাছে থোকায় থোকায় আম ঝুলছে। একেক জাতের আমের গঠন একেক রকম। কোনোটি গোলাকার আবার কোনোটি লম্বা।


আম কিনতে আসা ক্রেতা আফসানা আফ্রিন ও বাগান পরিদর্শনে আসা রাহেলা আক্তার বলছেন, মেজর (অব.) সোলায়মান প্রমাণ করেছেন আন্তরিক হয়ে যত্ন নিলে মফস্বলেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, নওগা, রংপুর ও বিদেশী আম ফলানো সম্ভব।


সোনাগাজী সোয়াস এগ্রো কমপ্লেক্সে কর্মরত কর্মচারী ও শ্রমিকরা জানায়, মেজর সোলায়মানের একক প্রচেষ্টায় ৭০ একর জায়গা জুড়ে সমন্বিত খামার ও বাগানে বর্তমানে দেশী-বিদেশী মিলে ১০২ জাতের আম আছে। বাগানে নানা জাতের আম লাগিয়ে ক্ষান্ত হননি মেজর সোলায়মান। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নতুন জাতের আম গাছ উদ্ভাবনে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। খামারে মাছ চাষ, গবাদিপশু পালনের পাশপাশি কোনো ধরনের কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই বিষমুক্ত উপায়ে ফলের বাগান প্রতিষ্ঠা করেছেন এ সেনা কর্মকর্তা। বাগানে প্রায় ছোট-বড় ১০ হাজার আম গাছে এবার আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। এছাড়া বাগানে আমের পাশাপাশি কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, নারকেল, ড্রাগন ফল, জামরুলসহ ওষুধিগাছের বাণিজ্যিক চাষও করা হয়েছে। বাগানে ৩৫জন কর্মচারী স্থায়ীভাবে কর্মরত রয়েছেন। আর দৈনিক মজুরী ভিত্তিতে আরও ২০জন শ্রমিক কাজ করছেন।
খামারের কর্মরত শ্রমিক মাহীব গাজী বলেন, তার বাড়ি বরিশালে। তিনি দীর্ঘ ৪০বছর ধরে মেজর সোলায়মানের সঙ্গে আছেন। এখানে থেকে আম বাগান ও খামার দেখা শুনা করেন। শ্রমিকদের সঙ্গে থেকে সবাইকে কাজ বুঝিয়ে দেন।


মেজর (অব.) মো. সোলায়মান বলেন, তার সমন্বিত বাগানে প্রায় ১০ হাজার আমের গাছ আছে। এ বছর আরও এক হাজার চারাগাছ লাগাবেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে ক্রেতারা তার বাগানে এসে আমসহ বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ কিনে নিয়ে যায়। ১৫ বছর ধরে তিনি বাগানের আম বিক্রি করছেন। বাংলা বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় এতিন মাস তার বাগানে প্রতিনিয়ত আম পাওয়া যায়। তবে বছরের অন্যান্য সময়ও কয়েকটি জাতের আম বিক্রি করে থাকেন। গত দেড়মাসে তিনি ৩০ মেট্টিক টন (৩০ হাজার কেজি) আম বিক্রি করেছেন। এবার তার প্রায় ১০০ মেট্টিক টন আম বিক্রি করার লক্ষ্য রয়েছে। এভাবে আরও কয়েক মাস আম বিক্রি করা হবে। বাগানে দেশী জাতের আমের বিক্রি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এখন থাইল্যান্ডের থাই জাতের আমসহ বিদেশী কয়েকটি জাতের আম পাকতে শুরু করেছে। এ সব আম খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু। প্রতি কেজি একশ টাকা করে বিক্রি করলেও কিছু আম রয়েছে দেড়শ-দুইশ টাকা কেজিতে বিক্রি করেন। এছাড়া আফানসো, রুবি, দোসারি ও রাঙগুয়াইসহ আরও কয়েকটি জাতের বিদেশী আম ধরেছে বাগানে। মেজর সোলায়মান তিনি নিজে গবেষণা করে ১০টি আমের জাত উদ্ভাবন করেছেন। যার মধ্যে মধুরানী ও দিলরুবা উল্লেখযোগ্য। এ আমের ফলনও ভালো হয়েছে। এখন তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি ও সেতু নামে দুটি আমের জাত নিয়ে কাজ করছেন।


সেনা কর্মকর্তা মেজর সোলায়মান বলেন, এ অঞ্চলের মানুষ বিদেশী জাতের আম চাষ তো দূরের কথা রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আমের চাষ করেন না। অথচ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করলে এসব জাতের আম এখানেও ভালো ফলবে। সোনাগাজীর মাটির উর্বরতা শক্তি খুবই ভালো। এখানের মাটিতে সব ধরণের ফসল ও ফলন ভালো হয়। তার উজ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে সোনাগাজী সোয়াস এগ্রো কমপ্লেক্স।


তিনি আরও বলেন, তার বাগানে উৎপাদিত আমে কোনো ধরনের কীটনাশক ব্যবহার হয় না। শুধুমাত্র আমের মুকুল আসার দুইমাস আগে পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে একবার কীটনাশক ছিটানো হয়। এছাড়া গাছে ইউরিয়া সার দেওয়ার পরিবর্তে নিজের তৈরী করা জৈব সার ও কম্পোষ্ট সার ব্যবহার করেন।


মেজর সোলায়মান বলেন, সেনাবাহিনী থেকে অবসরে এসে তিনি স্বার্থক হয়েছেন। নিজে শ্রমিকদের সঙ্গে বাগান ও খামার পরিচর্যার কাজ করেন বলে বৃদ্ধ বয়সেও তিনি এখন সুস্থ এবং সবল দেহের অধিকারী। তার বাগান থেকে স্থানীয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে আমসহ বিভিন্ন গাছের চারা নিয়ে পরামর্শ মতে বাগান তৈরী করেছেন। তার খামারে উৎপাদিত মধু, সরিষাসহ সব ধরনের ফল ও ফসল ভেজাল মুক্ত। ভবিষ্যতে খামারের পরিধি আরও বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
মেজর সোলায়মানের সাফল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাইন উদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি একাধিকবার মেজর সোলায়মানের বাগান পরিদর্শন করেছেন। এ বাগানে উৎপাদিত আমের গুণগত মান অনেক ভালো। বাগানটিও বেশ পরিচ্ছন্ন। তিনি দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু আমের জাত বাগানে লাগিয়ে সফল হয়েছেন। চেষ্টা করেন জৈব সার দিয়ে এবং কীটনাশক ব্যবহার না করে আম ফলাতে। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে সব সময় খামারে রোগবালাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পরামর্শসহ সব ধরনের সহযোগীতা করে আসছেন। তার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে এখন উন্নত জাতের আমের বাগান করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!