অক্টোবর ৬, ২০২৬ ১১:২০

শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে সোনাগাজী ছাবের পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়


* ইংরেজি শিক্ষক নেই ১৫বছর ধরে
* সহকারী শিক্ষকের ২৫টি পদে কর্মরত মাত্র ৭জন
* কারিগরি ৭টি পদের ৬টি শূণ্য
* ৩টি ভবনের ১টি ভবন ব্যবহার অনুপযোগী

নিজস্ব প্রতিনিধি :

সোনাগাজী মো. ছাবের সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৫বছর ধরে নেই ইংরেজি শিক্ষক। ইংরেজির পাঠদান করান অন্য বিষয়ের শিক্ষকেরা। ফলে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিতে পিছিয়ে পড়ছে। ইংরেজির মতো আরও ছয়টি বিষয়েও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকের সব কয়টি পদ শূন্য রয়েছে। গণিতেও মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে এতদিন ষষ্ঠ-দশম শ্রেণির পাঠদান চলছিল। কিন্তু গত জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে হঠাৎ করে তিনি মারা যাওয়ায় এখন গণিতের শিক্ষকের পদও ১০মাস ধরে শূন্য। একইসঙ্গে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। চলতি বছর বিদ্যালয়টি থেকে ২শ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছে ১শ ৩৫জন। জিপিএ:৫ পেয়েছে ১৯জন। ফেল করা শিক্ষার্থীরা সবাই ইংরেজি বিষয়ে খারাপ করেছে।

বিদ্যালয় সূত্র জানায়, ১৯৪৫সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৭সালের ৩০আগষ্ট সোনাগাজী মো. ছাবের পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে কারিগরি শাখাসহ শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭শ ১০জন। বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষকের পদ রয়েছে ৪টি। এতে ২০১০সালে আগে একজন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। তিনি চাকরি নিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পর থেকে ইংরেজি বিষয়ে আরও কোন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি।

এদিকে বিদ্যালয়টিতে সহকারি প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকের পদও খালি রয়েছে ১৮টি। বর্তমানে সহকারি শিক্ষকের ২৫টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৭জন। একইসঙ্গে কারিগরি শাখায় ৭জন শিক্ষকের পদ রয়েছে। সেখানেও ৬টি পদ খালি।

এছাড়া প্রধান শিক্ষক থাকলেও ২০১৩ সালের পর থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। শিক্ষক সংকটের কারণে ৬জন খন্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান দিতে হচ্ছে। একইসঙ্গে বিদ্যালয়টিতে কারিগরি শাখাসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১০টি পদের মধ্যে ৩জন কর্মরত রয়েছেন। শূন্য রয়েছে ৭টি পদ। বিদ্যালয়ের ৩টি ভবনের মধ্যে ১টি ভবন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় পাঠদানে ভবন সংকট দেখা দিয়েছে। নেই বিজ্ঞানাগারসহ বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বেষ্টনি, গেইট ও পুকুর পাড়ে সুরক্ষা দেয়াল।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, ইংরেজি শিক্ষক না থাকায় অন্য শিক্ষকরা তাদের ইংরেজি পড়ান। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে সঠিকভাবে ইংরেজি পড়া না বুঝায় তারা অন্য বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে সিলেবাস শেষ করাসহ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। তারা দ্রুত ইংরেজিসহ সকল বিষয়ের শূন্য পদে শিক্ষক পদায়নের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করে।

বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘ইংরেজি শিক্ষক না থাকায় অন্য শিক্ষকেরা তাদের ইংরেজি পড়ান। কিন্তু শ্রেনিকক্ষে ইংরেজি পড়া না বুঝায় তারা অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এতে করে তাদের সময় এবং অর্থ দুদিকে ক্ষতি হয়।’

দশম শ্রেণির ছাত্র মাহমুদুল হাসান জানান, সে কারিগরি শাখায় পড়ছে। তাদের শাখায় ৭জন শিক্ষকের পদ থাকলেও মাত্র ১জন শিক্ষক দিয়ে তাদের শ্রেনি কার্যক্রম চলছে। এভাবে চলতে থাকলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা দ্রুত বিদ্যালয়ের শূন্য পদে শিক্ষক পদায়ন করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানায়।
সহকারি শিক্ষক সুলতান আহম্মদ জানান, বিদ্যালয়ে গণিত বিষয়ে শিক্ষকের ৩টি পদ রয়েছে। ২টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় জসিম উদ্দিন এককভাবে সব ক্লাসের গণিত পড়াতেন। গনিত বিষয়ে ১জন খন্ডকালিন শিক্ষক থাকলেও নতুন কারিকুলামে তিনি অব্যস্ত নন। তাই ষষ্ঠ-দশম শ্রেনি পর্যন্ত সব ক্লাসে গণিত বিষয় নিয়ে তার ওপর বাড়তি চাপ ছিল। গত জানুয়ারী মাসে হঠাৎ করে তার মৃত্যুতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জয়নুল আবেদীন বলেন, দীর্ঘ ১৫বছর ধরে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নাই। জাতীয়করনের আট বছর পরও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষক পাওয়া যায়নি। এতে করে বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ইংরেজি বিষয়েই বেশি খারাপ করছে শিক্ষার্থীরা। ইংরেজি বিষয়ে অন্তত একজন হলেও শিক্ষক পদায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে গনিতের শিক্ষকের আকস্মিক মৃত্যুতে শিক্ষার্থীরা এখন গণিত নিয়েও সমস্যায় পড়েছে।

প্রধান শিক্ষক মো. জয়নুল আবেদীন বলেন, একজন শিক্ষক সপ্তাহে ১৫টি ক্লাস নেয়ার কথা। এখন নিচ্ছেন ৩০টি। শিক্ষক পদায়নসহ সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আমরা বারবার কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু সংকট নিরসন করা হচ্ছে না।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘ঘরে-বাইরে ইংরেজির প্রয়োজন কতটা। তা শহরের সঙ্গে সঙ্গে মফস্বলের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-অভিভাবকেরাও তা মর্মে মর্মে বুঝতেছে। ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক সংকটের কারণে ওই বিদ্যালয়ের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। তাই বিদ্যালয়ের শূন্যপদগুলো পূরনের জন্য তালিকা সুপারিশসহ ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারজান হোসাইন সরকারি বিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক না থাকা দু:খজনক বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘বেশির ভাগ শিক্ষার্থী এমনিতেই ইংরেজিতে দুর্বল। তার ওপর এই বিষয়ের শিক্ষকই যদি না থাকেন, তাহলে তারা কীভাবে পড়বে। দ্রুত ইংরেজি ও গণিতসহ শূন্য পদের বিষয় গুলোতে শিক্ষক পদায়নের জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন পাঠানো হয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!