দৈনিক ফেনীর সময়

ক‚টনীতি-রাজনীতির আপ-ডাউন

ক‚টনীতি-রাজনীতির আপ-ডাউন

রাষ্ট্রের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে দক্ষ ক‚টনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। আধুনিক যুগে বৈদেশিক সম্পর্ক চাট্টিখানি বিষয় নয়। ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কই হোক বা বন্ধুপ্রতিম সম্পর্কই হোক, মনে করার কারণ নেই যে সবাই সব সময় ভাইয়ের মতো মমতা মাখানো বা বন্ধুর মতো অন্তরঙ্গ আচরণ করবে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে। বৈদেশিক সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর। আমি তোমাকে দেব, তুমি আমাকে দেবে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থ। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার ক‚টনৈতিক সম্পর্ক প্রেম-প্রীতির ব্যাপার নয়; দেওয়া-নেওয়ার বিষয়; মর্যাদা ও স্বার্থরক্ষার বিষয়। তাই বেশি, অতিরিক্ত, বাড়তি কিছুই ভালো ফল দেয় না, এর প্রমাণ আবারো আমাদের সামনে। ঢাকাস্থ ক‚টনীতিকদের বাড়তি নিরাপত্তা ইস্যুতে দেশ গরম। বিশ্বমিডিয়ায় নেতিবাচক ধারনা বাংলাদেশের অতিথি নিরাপত্তা নিয়ে। অযাচিত-অনাকাঙ্খিতভাবে এ কাজটা আমরাই করে ফেললাম। আর সেটা ঢাকতে গিয়ে অতিরিক্ত-অপ্রয়োজনীয় কথার ছড়াছড়ি। এক কথা দিয়ে আরেক কথা ঢাকতে গিয়ে অতিরিক্ত কথামালা। যে যা বলেন, সবই যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণের চেষ্টাও। এসবের মধ্য দিয়ে একটা ধাক্কা পড়লো বাংলাদেশের বিদেশি মেহমান সমাদরের ঐতিহ্যের ওপর।

ঢাকায় বিদেশি ক‚টনীতিকদের নিরাপত্তা প্রত্যাহার নিয়ে এক পর্যায়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অর্থনৈতিক অবস্থার অজুহাত দিয়েছেন। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নানা কৃচ্ছসাধন করতে হচ্ছে বলে যুক্তি দিয়েছেন তিনি। এক পর্যায়ে বলে ফেলেছেন, ক‚টনীতিকদের বাড়তি নিরাপত্তা–সুবিধা দিলে বিদেশিদের কাছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিয়ে ভুল বার্তা যায়। আমরা ভুল বার্তা দিতে চাই না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শুরু করা কথা ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পাকানো ভেজালের মাঝে নতুন আরেক কথা বলে বসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বলেছেন, বাড়তি নিরাপত্তা চাইলে অর্থ দিতে হবে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছ থেকে যে বাড়তি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়েছে, তা তারা চাইলে ফেরত দেওয়া হবে। তবে এ জন্য তাদের অবশ্যই অর্থ দিতে হবে। বিদেশি ক‚টনীতিকরা না চাইলেও কয়েকটি দেশকে বিশেষ প্রয়োজনে বাড়তি বিশেষ নিরাপত্তা তথা সুরক্ষা দিয়ে আসছিল সরকার। সেটাও লিখিত নয়। মুখে মুখে দেয়া হুকুমই বাস্তবায়ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ি, সরকার এখন মনে করে ওই বাড়তি নিরাপত্তা দেয়ার আর দরকার নেই।

ফলে, এক এক সময় এক এক কথা বলে জটিলতা আরো পাকানো হয়েছে। আসল সমস্যাটা তো ‘বাড়তি’ আর ‘মনে করা’ নিয়েই। প্রয়োজনে মনে হয়েছে বাড়তি সমাদর করা দরকার। আবার মনে হয়েছে দরকার শেষ।তাই শেষ। মূলকথা সবই মনে করা, প্রয়োজন আর বাড়তির বাড়াবড়ি। আড়াল করার কোনো উপায় নেই যে,যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক আগের মতো ভালো যাচ্ছে না। সেটা হতে পারে নির্বাচন, গণতন্ত্রায়ণ, বাক-স্বাধীনতা প্রশ্নে। অবশ্য দীর্ঘ সময় এ দেশগুলোই সরকারকে কেবল সমর্থন নয়, সহযোগিতাও দিয়েছে। ২০১৪-১৮ সালের প্রশ্নযুক্ত নির্বাচনকেও বৈধতা দিয়েছে। এখন নির্বাচন সামনে রেখে চিত্র ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আরো ভিন্ন হওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট। সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছে মাত্রা ছাড়িয়ে।

স্বাভাবিকভাবেই সরকারের জন্য এটি বিব্রতকার। আর সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির জন্য পরমানন্দের। কখনো কখনো অবস্থার এমন প্রকাশ ঘটছে যেন, বিএনপির কথাগুলোই বিদেশি ক‚টনীতিকরা বলছেন। রাজনীতি আর ক‚টনীতি এখানে একাকার হয়ে পড়েছে। সেই একাকারে ফর্মে চলে যাচ্ছে ক‚টনীতি। রাজনীতির এ ক‚টনৈতিক ধকল এখন ক‚টনীতি না জানা মানুষও বুঝে ফেলছে। অতিক‚টনীতি চর্চায় বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনকে দেশের সীমানার বাইরের বিষয়আসয় করে ফেলার কাজটি শুরু হয়েছে আরো আগ থেকেই। এখন এটি একটা বিশেষ পর্যায়ে। সামনে তা আরো ডালপালা মেলছে। সাধারণ মানুষ দেখছে, কেউ বিদেশিদের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেয়ার আরজি নিয়ে ঘোরে। কেউ বিদেশিদের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচনের ওয়াদা দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশ বলছে, কেবল তারা নন, বিভিন্ন দেশেরও নজর বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের দিকে। সরকারের শীর্ষমহল থেকেও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওয়াদা শোনানো হচ্ছে বিদেশিদের কাছে। কিছুদিন ধরে যেসব বিদেশি হাই-প্রোফাইল এসেছেন বা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের যারা বাইরে যাচ্ছেন তারা বিদেশিদেরকে আগামীতে বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু বা মডেল নির্বাচনের আশ্বাস শোনাচ্ছেন। জনগণ আর নামকাওয়াস্তেও ফ্যাক্টর থাকছে না। সরকার জনগনের চেয়ে বিদেশিদের কাছে ওয়াদা বেশি দরকার মনে করছে। আর বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলো সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জনগণকে নিয়ে মাঠ গরম করার চেয়ে বিদেশিদের কাছে যাতায়াতকে বেশি কার্যকর ভাবছে। যা করে ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮-তে করে টানা সফল হয়েছে আজকের ক্ষমতাসীনরা। প্রকৃতপক্ষে খেলা আগেরটাই। তবে এবার গতি একটু বেশি। আবার পরিস্থিতির বাঁকও নানান দিকে। আগের শত্রæ-মিত্র চেহারা ভিন্ন। পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচন প্রশ্নে বিদেশিদের কোনো কথা শোনা হবে না বলে বাড়তি আওয়াজও দিয়ে রাখছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। আবার মাঝেমধ্যে ক‚টনীতিকদের কাছেও চলে যায়। বিদেশ সফর কর্মসুচি করে। বড় বড় দেশ সমর্থন-সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে-মর্মে প্রচারণা চালায়। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাপান, যুক্তরাজ্যসহ শক্তিধর দেশগুলো মুগ্ধ-বিমোহিত; -এমন চমৎকৃত তথ্যও বাজারজাত করে। মোটকথা মুখে এদিক-ওদিক নানান কথা বললেও বিদেশিদের আয়ত্ব করার এক দুর্নিবার চেষ্টা আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুদিকেই। এ চেষ্টায় কেউ সেকেন্ড হতে চায় না।

আর বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কয়েকটি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কেবল নির্বাচনের কথাই আনছে। নানা নসিয়ত- তাগিদ দিচ্ছেন তাদের ঢাকাস্থ দূতরা। নির্বাচনের সঙ্গে সুষ্ঠু, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্যসহ কতো শব্দ তারা ব্যবহার করছেন! বিষয়টি বিএনপির জন্য যারপরনাই পুলকের। বিএনপির এমন তৃপ্তির ঢেঁকুর সরকারের জন্য আসলেই সহ্য করা কঠিন। যার একটি গরম প্রকাশ বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের বাড়তি নিরাপত্তা প্রত্যাহার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে আর বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের বাড়তি নিরাপত্তা সুবিধা দেবে না-মর্মে দেয়া বার্তাটি মাটিতে পড়তে পারেনি। চারদিক থেকে প্রতিক্রিয়ার ধুম। কারো প্রতিবাদ, কারো খুশিতে নানান কথার ছড়াছড়ি। সব ক‚টনৈতিক মিশন ও ক‚টনীতিকদের নিরাপত্তা দিতে হোস্ট রাষ্ট্র বাধ্য বলে বিবৃতি দিতে একটুও সময় নেয়নি ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। বিবৃতিতে বলা হয়, ভিয়েনা কনভেনশন অনুসারে সব ক‚টনৈতিক মিশন ও ক‚টনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থেকে সরার কোনো সুযোগ নেই হোস্ট রাষ্ট্রের, মানে বাংলাদেশের। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক‚নীতিকদের কয়েকজনের ওপর বিরক্তি সরকারের দিক থেকে মাঝেমধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে রাফ এন্ড টাফ ভাষায়। তারা বেশি ‘ঢং’ করেন বলে উষ্মা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া আরো কঠোর। যারা স্যাংশন দেয় তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশ আর কোনো কেনাকাটা করবে না-এমন ঘোষণা কম দুঃখে দেননি তিনি। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের ভ‚মিকায় ক্ষোভ তিনি জানিয়ে আসছিলেন অনেক দিন থেকেই। কারো কোনো চাপ তাকে টলাতে পারবে না-এমন সাহসী উচ্চারণের মাঝে এক পর্যায়ে বলেই বসেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বিভিন্ন দেশে সরকার পাল্টে দিতে পারে বলে। বিবিসিকে দেয়া স্বাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আওয়ামী লীগকে আর ক্ষমতায় চায় না। সরকারের দিক থেকে আসা এ ধরনের কথাও এক ধরনের বাড়তি কথা। সরকারের কেন এমন অবস্থান ও কঠোর কথা জানান দেয়া জরুরি হয়ে পড়লো, এ প্রশ্ন ঘুরছে। আবার সরকারের মাঝে আতঙ্ক-অস্থিরতাও স্পষ্ট। বিদেশি ক‚টনীতিকদের অতিমাত্রায় তোয়াজ-তোষণ বা ক্ষেপে গিয়ে যা ইচ্ছা বলা কোনোটাই শোভন নয়। বাংলাদেশে একসঙ্গে অসোভন কাজ দুটাই চলছে। ক‚টনীতিকদের পক্ষ থেকে সরকারকে জেনেভো কনভেনশনের কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। আবার সরকারের দিক থেকে জেনেভা কনভেনশনের সবক শোনানো হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, দুপক্ষের কেউই জেনেভা কনভেনশন জানেন না মনে করার কারণ নেই।

এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ছাড়াও তার পূর্ববর্তী কয়েকজনের নাম বেশ প্রাসঙ্গিক। তাদের সঙ্গে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ি যা করা যায় কছে সরকার। গত নভেম্বরে বাংলাদেশের ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট দেয়া নিয়ে মন্তব্য করে প্রশংসা-সমালোচনার দুটারই মুখে পড়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। তিনি তার বক্তব্যে গত নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির প্রসঙ্গটি এনেছিলেন। তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ে। ভিয়েনা কনভেনশন অনুসারে সরকার তা পারে। কনভেনশনটিতে সব ক‚টনৈতিক মিশন ও ক‚টনীতিকদের নিরাপত্তা হোস্ট দেশকে নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। আবার ক‚টনীতিকরা নিয়োগপ্রাপ্ত দেশে কোনো অসদারণ বা ক‚টনৈতিক নীতি বিবর্জিত কাজ করলে প্রত্যাহারসহ শাস্তি দেয়ার বিধানও আছে ভিয়েনা কনভেনশনে। এ কনভেনশনের বেশিরভাগ ধারাই ক‚টনতিকদের অনুকুলে। আবার ক‚টনীতিককে ডেকে পাঠানো-প্রত্যাহারের প্রচলনও আছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এ ধরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এর প্রায়শ্চিত্যও করতে হয়। বাংলাদেশকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোন দেশের ক‚টনীতিককে বরখাস্তের কলঙ্কে পায়নি।

পরিশেষে, বিচক্ষণ ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল তার এক বিখ্যাত উক্তিতে বলেছিলেন: রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু রাজনীতিবিদদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এর অনুকরণে আমরা বলতে পারি, ক‚টনীতি এমন জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে তা শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কোনো দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি দক্ষ, কাÐজ্ঞানসম্পন্ন ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত না হয়, তাহলে সেই দেশের গণতান্ত্রিক সরকারও ক‚টনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে পারে না। ক‚টনৈতিক ক্ষেত্রে অদক্ষতার কারণে একটি দেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!