দৈনিক ফেনীর সময়

বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রথম ও শেষ দেখা

বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রথম ও শেষ দেখা

মোস্তফা হোসেন

আজ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক পবিত্র দিন। ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। সেই মহান নেতা জন্মগ্রহণ না করলে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পাইতাম কিনা জানি না। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলন, ৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৪ সালে ফাতেমা জিন্নাহ্ নির্বাচনী ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ও ১৯৬৯ সালে ছাত্র জনতার ১১ দফা আন্দোলন, ১৯৭০ বাঙ্গালীল মুক্তির নির্বাচনের আন্দোলন, ১৯৭১ সালে ২৬ শে মার্চের স্বাধীনতা ঘোষনা, এই একটি মাত্র নাম বঙ্গবন্ধু নামেই নয় মাস মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিচালিত হয়। এই নামে বিশ^ব্যাপী বঙ্গবন্ধুকে বিশ^নেতৃত্বে আসিন করে। বঙ্গবন্ধু জীবনে একবার যাকে দেখেছেন বা নাম জানে তাকে আর দ্বিতীয়বার নাম বলতে হয় নাই। বঙ্গবন্ধু তাকে তার নাম ধরে ডেকেছেন। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়াছিলাম। আমাদের নিকট বঙ্গবন্ধুর নামই প্রেরণা যোগাইয়াছেন, যুদ্ধ করে লক্ষ লক্ষ লোক জীবন দিয়াছে জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে। সেই মহান নেতাকে ১৯৭৫ সালে ১৫ই আগস্ট হত্যা করে। কিছু বাঙ্গালী সামরিক বাহিনীর লোকজন, সেই নেতাকে পাকিস্তানি কারাগারে পাকিস্তানিরা হত্যা করতে সাহস করে নাই সেই নেতাকে হত্যা করল জারজ বাঙ্গালীরা।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আমরা যুদ্ধ করলাম ভারতীয় সাহায্য নিয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করলাম। ঐ সময় বাঙ্গালী রাজাকার জামাতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ (বর্তমানে ইসলামী ছাত্র শিবির) যদি পাকিস্তানিদের সাহায্য না করত তা হলে দেশ স্বাধীন হইতে একমাস লাগতো না। পৃথিবীর কোন দেশের সাহায্য প্রয়োজন হইত না। এক মাসেই আমরা দেশ স্বাধীন করতাম। নয় মাসের প্রয়োজন হইত না।

১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মুসলিম লীগ প্রার্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইয়ুব খান আর বিরোধী দলের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ একমাত্র বোন ফাতেমা জিন্নাহ্ আওয়ামী লীগ সহ কমবাইন্ড অপজিশন পার্টি (কপ) আইয়ুব খানের মার্কা গোলাপ ফুল আর ফাতেমা জিন্নাহ্ এর মার্কা হারিকেন। ফেনী কপের আহবায়ক ফেনী মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি খাজা আহমদ, আমি কপের দপ্তর সম্পাদক। নির্বাচনের খরচ বহনের জন্য কপ ফাতেমা ছবি দিয়ে ২,৫,১০ টাকার কূপন ছাপলেন। সেই কূপন আনার জন্য খাজা আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট চিঠি দিয়ে আমাকে ঢাকা পাঠাইলেন। তখন আওয়ামী লীগের অফিস ছিল ১৫ পুরানা পল্টন, ঢাকা। ৭০ সালে আওয়ামী লীগের অফিস ৫১ পুরানা পল্টন, ঢাকা। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ অফিস সার্কিট হাউজ রোড, ঢাকা (বর্তমানে তথ্য অফিস) । ৭৫ পরে আওয়ামী লীগ অফিস ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ঢাকা। আওয়ামী লীগ এই অফিসের তথ্য দিলাম। যারা ইতিহাস লিখবেন তাদের জন্য। খাজা আহমদের চিঠি নিয়ে রাতে ঢাকা মেইলে গেলাম, ফুলবাড়িয়া ষ্টেশনে সকালে নামলাম বেলা ১১ টার দিকে ১৫ পুরানা পল্টন গেলাম। বঙ্গবন্ধুর হাতে চিঠি দিলাম। বঙ্গবন্ধু ১৫ পুরানা পল্টনে পশ্চিম পাশের্^র রুমে বসতেন। পূর্ব পাশের্^ বসতেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ উল্ল্যা (পরে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি) মধ্যখানে বসতেন তাজউদ্দিন আহমদ সহ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাগণ। যেই নেতার নামে রাজনীতি করি তার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ, বুঝতেই পারছেন আমার মনের অবস্থা। দেখা হল, কূপন সংগ্রহ করলাম। বঙ্গবন্ধু ফেনীর রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন আর বললেন আমার নেতা কেমন আছে অর্থাৎ খাজা আহমদের কথা জিজ্ঞাসা করলেন বঙ্গবন্ধু কখনও খাজা আহমদকে নাম ধরে ডাকতেন না। সব সময় নেতা বা ফেনীর নেতা বলতেন। আমাকেও আদর করলেন। আসার সময় আমার মায়ের জন্য কিছু কিনতে এক হাজার টাকা দিলেন। ঐ টাকা দিয়ে মায়ের জন্য দুইট শাড়ী কিনলাম। মা মহা খুশি ও বঙ্গবন্ধুর জন্য দোয়া করলেন। আমার জীবনে প্রথম মায়ের জন্য শাড়ি কিনলাম বঙ্গবন্ধুর টাকায়। তখন আমি ফেনী মহকুমা দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও খাজ আহমদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক আমার দেশ পত্রিকায় কর্মরত। খাজা আহমদের দুইটি সাপ্তাহিক ছিল একটি সাপ্তাহিক সংগ্রাম ও অপরটি সাপ্তাহিক আমার দেশ। এই দুইটি পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পর জামায়েত ইসলামী দৈনিক সংগ্রাম প্রকাশ করে আর বিএনপি প্রকাশ করে দৈনিক আমার দেশ।
১৯৬৬ সালে আমি ফেনী মহকুমা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও সভাপতি খাজ আহমদ এম.এস হুদা সাধারণ সম্পাদক ও আমি বৃহত্তর নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক, চৌমুহনীর নুরুল হক জাতীয় শ্রমিকলীগের প্রতিষ্ঠতা সভাপতি। স্বাধীনতার পর ফেনী হইতে সাপ্তাহিক মতবাদ প্রকাশ করি আমার সম্পাদনায় মুজিব বাদ প্রচারের জন্য।

১৯৭৫ সালে খাজা আহমদ ফেনীর গভর্নর হওয়ার পর খাজা সাহেবের নেতৃত্বে আমরা ১৪ই আগস্ট সন্ধায় গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে চাই। আমাদের সাথে ছিলেন আবদুল মালেক, এম.এস হুদা, নুরুল হুদা, আবদুর রহমান বি.কম, সুজাত আলী, আবদুল হক মোটবী ও ইউনুছ চৌধুরী। বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করে ঐ রাত ৮টায় বাহির হই। বঙ্গবন্ধু ঐ সময় কালো মার্সিডিজ নিয়ে গণভবন ত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু যাওয়ার সময় গণভবনের গাছগুলি ঝড়ো হাওয়ায় মাথা নত করে বঙ্গবন্ধুকে চিরতরে বিদায় দিল। এই হল বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার শেষ দেখা। ভোর রাত ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে জারজ সন্তানেরা হত্যা করে।

আমি যতদিন কিছু লিখব, ততদিন এদেরকে স্মরন করতে হবে। খাজা আহমদ, আলহাজ¦ ছৈয়দ আহমদ, আবদুল মালেক, এম.এস হুদা, জয়নাল হাজারী, আমিন মৌলভী, আমিনুল করিম খোকা, জয়নাল আবেদীন হাজারী, সুলতান আহমদ শ্রীপুরী, আবুল কাসেম, সেলিম চৌধুরী, ফয়েজ আহমদ, আশ্রাফ খান, আজিজুল হক, সুজাত আলী, ইউনুছ চৌধুরী, আবদুল কাদের ডিলার, সিরাজুর ইসলাম, বেছু মিয়া রেস্টুরেন্ট, জালাল আহমমদ রেস্টুরেন্ট, হাবিবুর রহমান নবী হোটেল, আফজলের রহমান, ভবতোষ, অজি উল্ল্যা, আবদুল ওহাব, এরশাদ উল্যা পাটোয়ারী (স্টার লাইন) তোফাজ্জল হোসেন, বড় বক্কর, হেকিম মুন্সী, মোহাম্মদ আলী, আবদুল করিম (রামপুর), ডাক্তার সিরাজুল ইসলাম, সামছুল হক খান, আবদুল করিম পাঠান (অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন), ছালেহ আহমদ, পাউডার আবদুল আজিজ, এ.কে.এম সামছুল হক, এডভোকেট আবুল কাসেম, আজিজ আহমদ চৌধুরী (গোলাপ মিয়া), এডভোকেট আক্রামুজ্জামান, এডভোকেট জাহিদ হোসেন খসরু, কাজী আবদুল মালেক, রঘুনাথপুরের আলী আজ্জম, পেয়ার মেম্বার, চেয়ারম্যান আবু বক্কর, সালামত উল্যা ডিলার, কাজী নুরুল করিম ডিলার, সানু মিয়া, ছুপি ইসহাক, শ্রীদাম চন্দ্র দাস, রশিক লাল দাস, হাবিবুর রহমান পূর্ব চন্দ্রপুর, লাতু মিয়া, ঝাড়– মিয়া, মোহাম্মদ ইসহাক (বক্তারমুন্সী), মোহাম্মদ হোসেন, মামুদুল হক, আমানী, আলহাজ¦ কোব্বাদ আহমদ, নুর মোহাম্মদ হাজারী, নুরুল ইসলাম হাজারী, কাজী জুলফিকার, লাকী সুলতান আহমদ, ডাক্তার ইসহাক, মাওলানা আবদুল ওহাব এরাসহ শত শত নেতা-কর্মী খাজা আহমদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম আন্দোলন করেছে। আজ বঙ্গবন্ধুর জন্ম দিনে তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। পরিশেষে বলতে চাই দেশ আমরা স্বাধীন করলাম। দেশ কাদের নিকট রেখে যাইতেছি। আমরা যারা জয়বাংলা, বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ বলে গলা ফাটাই, তাদের সন্তানেরা আজ কোথায় কোন আদর্শের পথে ? তারা আমরা কি আমাদের সন্তানদের খবর রাখি ? যদি তারা আমাদের আদর্শ বহন না করে তাহলে আগামীতে আমাদের আদর্শের কি হবে ? একটু চিন্তা করা দরকার।

আজ প্রজন্মকে অনুরোধ করব এ লেখার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে জানো, বাংলাদেশকে জানো, মুক্তিযুদ্ধকে জানো, তাহলে তোমাদেরকে কেউ আর স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে চিহিত করতে পারবে না। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, তাঁদের কাছে বিশেষ ভাবে অনুরোধ আপনার সন্তানদেরকে সঠিক কথাটি বলে যান, যাতে ইতিহাস বিকৃত না হয়। কারণ আপনি জীবিত থাকাবস্থায় যে কথাটি বলবেন আপনার সন্তানেরা সেটি বিশ^াস করবেন। -জয়বাংলা, জয়বঙ্গবন্ধু।

লেখক : ডেপুটি ক্যাম্প চীফ, মুহুরী ইয়ূথ ট্রেনিং ক্যাম্প ও
মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!